Home » বিভাগ » ইলিশের সাতকাহন

ইলিশের সাতকাহন

হাজার বছর ঐতিহ্য ধারণ করে অবশেষে ইলিশ আমাদের নিজস্ব সম্পদ হল। জিআই পণ্য হিসেবে ইলিশ নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। খুব দ্রুত আনুষ্ঠানিকভাবে মৎস্য অধিদফতরের কাছে ইলিশের জিআই নিবন্ধনের সনদ তুলে দেয়া হবে বলে জানিয়েছে পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদফতর। তবে প্রশ্ন জাগে, ইলিশ কি আগে আমাদের নিজস্ব সম্পদ ছিল না? শত শত বছর আগে থেকে লালন করা ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেতে এত লম্বা পথ পাড়ি দিতে হল কেন? তবে এই স্বীকৃতি আমাদের আনন্দের। আমাদের গর্বের।
তিন-চার দশক আগেও আমরা হাট-বাজারে মাইকিং করে ইলিশ মাছ বিক্রি করতে দেখেছি। ক্রেতারা হালি (৪টা) হিসেবে দরদাম করত। সুস্বাদু ইলিশের রূপ-গন্ধে বিমোহিত হতো না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। ১৯৮৩ সালে পাকসি গিয়েছিলাম। তখন ট্রেন ছাড়া যোগাযোগের মাধ্যম ছিল একটি মাত্র ফেরি। ওপারে ফেরি থাকলে এপারের মানুষকে ঘণ্টাখানেকের বেশি অপেক্ষা করতে হতো। অপেক্ষার এই সময়টুকুতে নদীর দুই পারের হোটেলগুলোর কর্মচারীরা হাকডাক শুরু করে দিত পদ্মার টাটকা ইলিশ খাওয়ার জন্য। সেসময় আমি মাঝারি সাইজের পুরো একটি ইলিশ মাছ ভাজা খেয়েছিলাম মাত্র ১৩ টাকায়। ১৯৮৩ থেকে ২০১৭ সাল। মাঝখানে ফারাক ৩৪ বছর। এই সাড়ে তিন দশকে পাল্টে গেছে ইলিশের চেহারা, দাম ও স্বাদ। ইলিশ এখন চলে গেছে কল্পনার জগতে। এর অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম জলবায়ুর পরিবর্তন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে নদীর নাব্য হারিয়ে স্রোতের গতি কমে যাওয়া।
ওয়ার্ল্ডফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬৫ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। এছাড়া ভারতে ১৫ শতাংশ, মিয়ানমারে ১০ শতাংশ, আরব সাগর তীরবর্তী দেশগুলো এবং প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগর তীরবর্তী দেশগুলোয় বাকি ইলিশ পাওয়া যায়। বাংলা ও অসমীয়া ভাষায় ‘ইলিশ’ শব্দটি প্রচলিত। ওড়িয়া ভাষায় একে বলা হয় ‘ইলিশি’। তেলেগু ভাষায় ইলিশকে বলা হয় ‘পোলাসা’। গুজরাটে স্ত্রী ইলিশ ‘মোদেন’ ও পুরুষ ইলিশ ‘পালভা’ নামে পরিচিত। পাকিস্তানের সিন্ধু ভাষায় ইলিশের নাম ‘পাল্লা’। বার্মিজরা বলে ‘সালাঙ্ক’।
বাংলাদেশের পদ্মা, যমুনা, মেঘনা ও কর্ণফুলী ছাড়াও ইলিশ পাওয়া যায় শাতিল আরব, ইরান, ইরাকের টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস, পাকিস্তানের সিন্ধু, মিয়ানমারের ইরাবতী এবং ভারতের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীর মিঠা পানিতে। বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে উত্তর উপকূল ছুঁয়ে পশ্চিমে ভারত সাগর হয়ে আরব সাগর, লোহিত সাগর পর্যন্ত দেখা যায় ইলিশের বিচরণ। আরব সাগর থেকে উত্তরে ওমান ও হরমুজ প্রণালী হয়ে পশ্চিমে পারস্য উপসাগরেও ইলিশের ঝাঁক দেখা যায়। বঙ্গোপসাগর থেকে আন্দামান সাগর আর মালাক্কা প্রণালী হয়ে চীন সাগরেও ইলিশ দেখা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি ইলিশ পাওয়া যায় আমাদের দেশে।
ইলিশ মূলত সামুদ্রিক মাছ, কিন্তু এর বৈশিষ্ট্য হল এই মাছ নদীতে ডিম দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বড় হলে ইলিশ মাছ আবার সাগরে ফিরে যায়। সাগরে ফিরে যাওয়ার পথে জেলেরা এই মাছ ধরে। জীবনচক্র পূর্ণ করতে ডিম ছাড়ার সময় হলে ফের উঠে আসে নদীর অগভীর পানিতে। ঘণ্টায় ৭১ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে ইলিশ। ডিম ছাড়ার জন্য এরা ১২’শ কিলোমিটার পানিপথ পাড়ি দিতে পারে অনায়াসে। তবে গভীরতা ৪০ ফুট হলে সাঁতরাতে সুবিধা হয় ওদের। উজানে চলার সময় কিছু খায় না এরা। ডিম ছাড়ে সাঁতরিয়ে সাঁতরিয়ে। একেকটি মাছ ডিম ছাড়তে পারে ২০ লাখ পর্যন্ত। সারা বছর ডিম দিলেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেই সবচেয়ে বেশি ডিম ছাড়ে ইলিশ।
নজরুল মৃধা : কবি ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

dsdc-114

Post_6

Sharing is caring!FacebookTwitterGoogle+PinterestWhat is Lorem Ipsum? Lorem Ipsum is simply dummy text of the printing and ...