Home » শীর্ষবার্তা » এই শিশু ও অনাগত সন্তানের পরিণতি কী?

এই শিশু ও অনাগত সন্তানের পরিণতি কী?

00
ভারতে আত্মীয়ের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া ১০ বছরের শিশু ও তার পরিবারের ওপর নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। বর্তমানে শিশুটি গর্ভাবস্থার ৩৪ সপ্তাহে রয়েছে। আইনে নিষেধাজ্ঞা ও জীবনের ঝুঁকি থাকায় পরিবারটি না পারছে শিশুটির গর্ভপাত ঘটাতে, না পারছে বিষয়টি মেনে নিতে। এত অল্প বয়সে সন্তান জন্মদানের সময়ও শিশুটির জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। শিশুটির বাবার অনুভূতি এই যে তাঁর মেয়েকে খুন করা হয়েছে। এর মধ্যে সংবাদকর্মীদের জুলুম তো আছেই।

১০ বছরের মেয়েটির গর্ভপাত ঘটানোর অনুমতি চেয়ে পিটিশন দাখিল করা হয়। গত ২৮ জুলাই পিটিশনটি খারিজ করে দেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। তখন মেয়েটির গর্ভাবস্থার ৩২ সপ্তাহ চলছিল। চিকিৎসকদের একটি প্যানেল আদালতকে জানান, এই পর্যায়ে গর্ভপাত করানো মেয়েটির জন্য ‘খুবই ঝুঁকিপূর্ণ’। মেয়েটির গর্ভের শিশুটি ‘ভালো আছে’। আদালতের ওই আদেশের পর চরম হতাশ শিশুটির পরিবার।

ভারতীয় আইনে অন্তঃসত্ত্বার ২০ সপ্তাহ পর গর্ভপাত নিষিদ্ধ। নারী-‍পুরুষের আনুপাতিক বৈষম্য কমাতে এই কঠোর আইন করা হয়েছে। ভারতের সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিনের গেঁড়ে বসা প্রথা অনুযায়ী, দেশটিতে ছেলেসন্তানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। যার কারণে বছরের পর বছর লাখ লাখ মেয়েশিশুর ভ্রূণ হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০ সপ্তাহ পর ভ্রূণের লিঙ্গ জানার পর এসব হত্যার ঘটনা ঘটে বলে আরোপ করা হয় ওই নিষেধাজ্ঞা।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ বিষয়ে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে বেশ কয়েকটি পিটিশন দাখিল করা হয়। এই পিটিশন দাখিল করা ব্যক্তিদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা কয়েকজন নারী রয়েছেন, যাঁরা ২০ সপ্তাহ পর গর্ভপাত করাতে চান। এ বিষয়টি আদালত সব সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়ে থাকেন।

তিন সপ্তাহ আগে পেটের নিচের অংশে ব্যথা অনুভূত হওয়ার পর শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায় তার মা। এ সময় শিশুটির অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। শিশুটির নিয়মিত দেখভালে থাকা ব্যক্তি বলেন, ‘সে খুবই সরল। মেয়েটির যে কী সমস্যা, এ ব্যাপারে তার কোনো ধারণাই নেই।’ তিনি বলেন, শিশুটির অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার লক্ষণগুলো আগে থেকে বুঝতে পারেননি তার মা-বাবা। কারণ, শিশুটি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। তাঁরা কল্পনাও করতে পারেননি যে তাঁদের কন্যা ১০ বছরেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়বে। শিশুটিকে এখনো তার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি জানানো হয়নি। শিশুটির সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিরা তাকে বলছেন, তার পেটে বড় পাথর হয়েছে। এ কারণে পেট বড় হচ্ছে। তাকে ডিম, দুধ, ফল, মাছ ও মুরগি খেতে দেওয়া হচ্ছে। শিশুটি এসব খাবার উপভোগ করছে বলে মনে হচ্ছে।

তবে শিশুটির বাড়িতে সম্প্রতি পুলিশ, সমাজকর্মী ও আইনজীবীদের আনাগোনা বেড়েছে। বাড়ির বাইরে সংবাদকর্মীদের ভিড় ক্রমে বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন মা-বাবা। পরিবারটি দরিদ্র। বাস করে ছোট এক রুমের ফ্ল্যাটে। শিশুটির বাবা সরকারি কর্মচারী। মা অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন।

মামলাটির তদন্ত করছেন প্রতিভা কুমারী নামের এক নারী পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘পরিবারটি ছিমছাম আর সাদাসিধে। তারা ভাবতেই পারেনি ওই ব্যক্তি তাদের মেয়ের সঙ্গে এমন কাজ করতে পারেন। শিশুটির পরিবার এখন পাগলপ্রায়।’ ওই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘শিশুটির কান্না ছাড়া তাঁর সঙ্গে কোনো কথাই এখনো পর্যন্ত বলেননি। শিশুটির বাবা বলেছেন, তাঁর মনে হচ্ছে তাঁর মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে।’

পরিস্থিতি বেশি খারাপ হতে থাকে, যখন এই ধর্ষণ ও অন্তঃসত্ত্বার খবর দেশটির গণমাধ্যমে শিরোনাম হতে থাকে, পরিবারটি সংবাদকর্মীদের জ্বালাতনের শিকার হতে থাকে। শিশুকল্যাণ কমিটির সভাপতি নিল রবার্টস বিবিসিকে বলেন, ‘শিশুটির বাবা যখনই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে, তখনই তিনি আমাকে বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন সংবাদকর্মীরা।’
ঘটনাটি নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রচারণা পরিবারটির জন্য তীব্র কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুটির বাবা যখন কাজে বের হন, তখন অনেক সাংবাদিক ওই বাড়িতে যান। শিশুকর্মী পরিচয় দিয়ে তাঁরা বাড়িতে ঢুকে পড়েন।

অভিযুক্ত ধর্ষণকারী শিশুটির মায়ের চাচাতো ভাই। অনেক সংবাদকর্মী এ ধরনের প্রশ্নও করেছেন যে শিশুটির মা বিষয়টি জেনেও অনুমোদন দিয়েছেন কি না। ‘মেয়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা, এটা তিনি (শিশুটির মা) কীভাবে এত দিন না জেনে ছিলেন?’—কেউ কেউ এমন প্রশ্নও করেছেন।
সংবাদকর্মীদের এ ধরনের জ্বালাতনে অতিষ্ঠ শিশুটির পরিবার। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। শিশুটির বাবা বলেন, ‘আমি তার (অভিযুক্ত ধর্ষণকারী) কঠোর শাস্তি চাই। তার মৃত্যুদণ্ড বা সারা জীবন কারাগারে থাকার সাজা পাওয়া উচিত। সে তার অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। তবে সে কখনোই আমাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেনি।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা কেন আমার মেয়ের বিষয়টির বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন? গণমাধ্যম ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।’

শিশুটির বাবার ক্ষোভের কারণ রয়েছে। ধর্ষণের শিকার হওয়া ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশে গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ধর্ষণকারীর পরিচয় ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এতে করে প্রতিবেশীসহ অনেক লোকজন পরিবারটিকে চিনে ফেলেছে। শিশুটির বাবার সহকর্মী ও প্রতিবেশীরা সবাই এখন ঘটনাটি জানেন। সম্ভবত শিশুটির স্কুলের বন্ধুরাও ঘটনাটি জেনে ফেলেছে।

প্রথম দিকে স্থানীয় এক সাংবাদিক সাক্ষাৎ করতে গেলে তাঁর কাছে শিশুটির পরিবার মেয়েটির ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক লজ্জা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান। শিশুটির স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তার বাবা।

পুলিশ অভিযুক্ত ধর্ষণকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। এ মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চণ্ডীগড় স্টেট লিগ্যাল সার্ভিসেসের আইনজীবী মহাবীর সিং বলেন, ‘১৪-১৫ বছরের কিশোরীদের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ঘটনা আমরা অনেক দেখেছি। তবে ১০ বছরের শিশুর ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম দেখলাম।’

স্বাস্থ্য পরীক্ষায় দেখা গেছে, শিশুটির স্বাস্থ্য ভালো রয়েছে। সে সামান্য রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। তবে এখানে অন্য আশঙ্কা রয়েছে। শিশুটি হৃদ্‌যন্ত্রে ফুটো নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। ২০১৩ সালে চিকিৎসকেরা এ সমস্যার সমাধান করেন। যদিও চিকিৎসকেরা বলছেন, গর্ভাবস্থায় ওই বিষয়টি কোনো সমস্যা তৈরি করবে না। তবে মূল আশঙ্কা হলো সন্তান জন্মদানের জন্য মেয়েটির বয়স অত্যন্ত কম।

প্রতিবছর ভারতে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে ৪৫ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক নারী মারা যান। ১৫ বছরের মেয়েদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি। আর চিকিৎসকেরা বলেছেন, ১০ বছরের মেয়ের ক্ষেত্রে এই আরও অনেক বেশি।

শিশুটির সন্তান জন্ম দেওয়ার সম্ভাব্য সময় সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটির সন্তান জন্ম দেওয়া হবে। কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হলে আগেই অস্ত্রোপচার করা হবে। শিশুটির পরিবার বলেছে, তারা নবজাতককে চায় না। কেউ দত্তক না নেওয়া পর্যন্ত ওই নবজাতকের দেখাশোনা করবে শিশুকল্যাণ কমিটি।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, ১০ বছরের শিশুটি মানসিক আঘাত পেতে পারে। তাকে কয়েক বছর ধরে শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের অধীন কাউন্সেলিং করানোর প্রয়োজন হতে পারে।

এক শিশু অধিকারকর্মী বলেন, ‘১০ বছরের মেয়ে কি সন্তানের জন্ম দিতে পারে? এটা কি মেয়েটির জীবন হুমকিতে ফেলবে? তার যাতে খারাপ কিছু না ঘটে, তার জন্য আমরা প্রার্থনা করছি।’
বিবিসি অনলাইনে অবলম্বনে কৌশিক আহমেদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ee

হাঁকডাক দিয়ে ইলিশ বিক্রি

Sharing is caring!FacebookTwitterGoogle+Pinterestপটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় রাবনাবাদ নদ ও বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। ...