Home » অর্থ-বাণিজ্য » কৌশলে ৯২১ কোটি টাকা নিয়েছে মাদারীপুর স্পিনিং

কৌশলে ৯২১ কোটি টাকা নিয়েছে মাদারীপুর স্পিনিং

বেসরকারীকরণের পর নানা কৌশল করে রূপালী ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা বের করে নিয়েছে মাদারীপুর স্পিনিং মিলস। সুদসহ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের পাওনা এখন ৯২১ কোটি টাকা। চুক্তি না মানায় সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে অধিগ্রহণ করায় এখন বিপাকে পড়েছে ব্যাংক।

আবার রূপালী ব্যাংকও নানা অনিয়ম করে মাদারীপুর স্পিনিংকে বিভিন্ন ধরনের ঋণ সুবিধা দিয়েছে। সরকারকে বিক্রির অর্থ প্রদানের নিশ্চয়তাও দিয়েছিল ব্যাংক। এমনকি দীর্ঘ বছর ধরে ঋণের টাকা শোধ না করলেও ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে নজিরবিহীনভাবে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নবায়ন সুবিধা দিয়েছে।

বিপুল দেনা সৃষ্টি করা এ প্রতিষ্ঠানকে ১৯৯৪ সালে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয় সরকার। হস্তান্তরের ২৩ বছরেও সরকারকে বিক্রির টাকা পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটি গত ১৪ জুলাই অধিগ্রহণ করে সরকার। এরপর বন্ধ হয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন। এ পরিস্থিতিতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে রূপালী ব্যাংক বলেছে, ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ঋণ আটকে পড়ায় আমরা এক অস্বাভাবিক সংকটে পতিত হয়েছি।’

রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত ঋণ তো এক দিনে হয়নি, ২৩ বছর ধরে অর্থায়ন করা হয়েছে। সরকারের অনুমোদন নিয়ে কারখানা জামানত রেখে অর্থায়ন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চালু হলে ঋণ আদায় হবে। শুনেছি তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে।’

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, রূপালী ব্যাংক ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালের ২৭ এপ্রিল মাদারীপুর টেক্সটাইল মিলসকে মেসার্স মিডিয়া ইন্টারন্যাশনালের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে এটির নাম পরিবর্তন করে হয় মাদারীপুর স্পিনিং মিলস। সে সময় ৮ কোটি ৭ লাখ টাকায় বিক্রি হয় প্রতিষ্ঠানটি। বিক্রির ২৫ শতাংশ অর্থ হিসাবে ওই সময়েই ২ কোটি ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। বাকি অর্থ পরিশোধের জন্য সরকারকে নিশ্চয়তা দেয় রূপালী ব্যাংক। তবে হস্তান্তরের ২৩ বছরেও সরকারকে বাকি অর্থ পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে যান। ওই সময়েই সিদ্ধান্ত হয়, মন্ত্রণালয় যেসব প্রতিষ্ঠান অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করেছে এবং হস্তান্তরের শর্ত ভেঙেছে, তা ফেরত আনা হবে। মন্ত্রণালয় এমন ৪৮টি প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে।

এর ধারাবাহিকতায় গত ১৩ জুলাই বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে বলা হয়েছে, মিল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে পাওনা পরিশোধের জন্য বারবার তাগাদা ও চূড়ান্ত নোটিশ দিলেও তারা পরিশোধ করেনি। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষ মিলটি পরিচালনা না করে বন্ধ অবস্থায় ফেলে রেখেছে, এতে হাজারো শ্রমিক কর্মচারী কর্মসংস্থানবঞ্চিত হয়েছে। এ কারণে জনস্বার্থে চুক্তি বাতিল করে প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় শেয়ার, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সরকার কর্তৃক পুনঃ গ্রহণ করা হলো। এরপর গত ১৪ জুলাই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। এখন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এই মিল।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরী এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, বিক্রয় শর্ত লঙ্ঘন করায় প্রতিষ্ঠানটি পুনঃ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার নিজ উদ্যোগে মিল পরিচালনার চেষ্টা করবে। বিটিএমসি এসব দেখাশোনা করবে।

তবে মিল সূত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রজ্ঞাপনে মিল বন্ধ থাকার কথা বলা হলেও আসলে তা চালু ছিল। তবে বেতন-ভাতা নিয়মিত ছিল না। প্রায় দুই হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন সেখানে। এমনকি মুনাফাও করছিল। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক নিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৩ কোটি ১১ লাখ টাকা ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নিট মুনাফা ছিল ১৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার এ ব্যবসায়িক মডেলটা ঠিক ছিল কি না, এটা ভাবার সময় এসেছে। এ ছাড়া তারা এত ঋণ নিয়ে কী করল, ব্যাংক কেন এত টাকা দিল, কারা বিভিন্ন সুবিধা দিল—এসব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মতিঝিলের সেনাকল্যাণ ভবনের ১৮ তলায় মাদারীপুর স্পিনিং মিলের কার্যালয়। এটি মূলত ইউসুফ গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। এর কর্ণধার ইউসুফ বাবু। গ্রুপের অধীনে আরও রয়েছে ইউসুফ সোলার এনার্জি, ইউসুফ নিট কম্পোজিট, ইউসুফ কম্পোজিট নিট, মিডিয়া শিপিং, ইউসুফ অ্যান্ড কোম্পানি, মিডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ইউসুফ হাউজিং এস্টেট। তবে এর বেশির ভাগই সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান।

বক্তব্য জানতে গত সপ্তাহের একাধিক দিন সেখানে গেলেও কেউই কথা বলতে রাজি হননি। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ইউসুফ বাবু পুরো পরিবার নিয়ে চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে আছেন।

রূপালী ব্যাংক সূত্র জানায়, মাদারীপুর স্পিনিং মিলের কাছে গত ৩০ জুন পর্যন্ত সুদসহ ব্যাংকের পাওনা ৯২১ কোটি টাকা। এ ঋণের মাত্র ৯৪ কোটি টাকা মেয়াদি ঋণ। বাকি পুরো টাকাই ব্যাংকিং নিয়ম লঙ্ঘন করে বের করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ব্যাংকও এই স্পিনিং মিলের পক্ষে বাকিতে ঋণপত্র খুলে দিয়েছে, তুলা আমদানি হয়েছে। সেই তুলা দিয়ে সুতা তৈরি হয়ে বাজারে বিক্রিও হয়েছে। তবে ঋণপত্রের টাকা পরিশোধ করেনি। তারপরেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে ব্যাংক নিজেই সময়মতো ঋণপত্রের টাকা বিদেশি বিক্রেতাদের শোধ করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, রূপালী ব্যাংকের পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই একাধিকবার প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণপত্র সুবিধা দেওয়া হয়। ‘ফোর্সড’ ঋণ থাকা সত্ত্বেও নতুন করে ঋণপত্র খোলা হয়। এভাবেই অবৈধ সুবিধা দেওয়া হয় মাদারীপুর স্পিনিং মিলসকে। এসব অনিয়মের জন্য ২০১২ সালে স্থানীয় শাখার মহাব্যবস্থাপক এস এম আতিকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে বরখাস্ত করে ব্যাংক।

রূপালী ব্যাংক সূত্র জানায়, এসব দেনার বিপরীতে জামানত হিসাবে রয়েছে মাদারীপুর স্পিনিং মিলের ২৯ একর জমি ও যন্ত্রপাতি। পাশাপাশি গুলশানের ৯ শতাংশ জমির ওপর ছয়তলা বাড়িও জামানত হিসাবে রয়েছে। তবে সরকার মিলটি অধিগ্রহণ করায় মিলের জামানত এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

15

যেভাবে যাত্রা শুরু ক্রেডিট কার্ডের

Sharing is caring!FacebookTwitterGoogle+Pinterest ১৯৪৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি রেস্তোরাঁয় নৈশভোজ করতে গিয়েছিলেন ফ্রাঙ্ক ম্যাকনামারা নামে ...