Home » সারাদেশ » গড়ছে ভাঙছে দল ও জোট

গড়ছে ভাঙছে দল ও জোট

একাদশ সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নতুন নতুন দল ও জোট গঠন হচ্ছে। আবার নতুন গড়া এসব দল ও জোটের মধ্যে ভাঙনও দেখা দিচ্ছে। এসব দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, আগামী সংসদ নির্বাচনে তাদের দলকে যে জোট যত বেশি আসন দিতে পারবে সেই জোটেই তাদের দল যোগ দেবে- মূলত এ সম্ভাবনা থেকেই দল ও জোট ভাঙছে। এক দল এক জোট ছেড়ে অন্য জোটে যোগ দিচ্ছে।

২৭ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করে এরশাদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোট (ইউএনএ) ছেড়েছে ২১টি ধর্মভিত্তিক দল। এসব দলের নেতারা ওইদিন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছেন যে, তারা জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ওপর আস্থা হারিয়ে জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

উল্লেখ্য, এপ্রিলে ৫৮টি দল নিয়ে জোট গঠন করেন এরশাদ। এর মধ্যে জাপা ও ইসলামিক ফ্রন্টের নিবন্ধন রয়েছে। বাকি দলগুলো নামসর্বস্ব। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে বহিষ্কার করে গঠিত বাংলাদেশ জাতীয় জোটের (বিএনএ) ব্যানারে ২২ দল এবং জাতীয় ইসলামী মহাজোটের ব্যানারে ৩৪টি দল জাপার নেতৃত্বাধীন ইউএনএতে যোগ দেয়। প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন ইসলামী মহাজোটের চেয়ারম্যান খাজা মুহিব উল্লাহ শান্তিপুরী। উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ইসলামী মহাজোটের কো-চেয়ারম্যান মাওলানা আতাউর রহমান আতিকী, জোটের সমন্বয়ক মাসুম বিল্লাহ নাফিয়ীসহ জাপার জোট ত্যাগী ২১ দলের নেতারা।

লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, এরশাদ একেক সময় একেক কথা বলেন। জোট শরিকদের না জানিয়ে তিনি আগামী নির্বাচনের জন্য ৩০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছেন। প্রার্থী তালিকায় ২১ দলের কোনো নেতার নাম নেই। তাই তারা এরশাদের ওপর ভরসা ও আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। তাদের আশঙ্কা, এরশাদ যে কোনো সময় তাদের ছেড়ে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে চলে যেতে পারেন।

এ ব্যাপারে ইউএনএ জোটে যোগ দেয়া বাংলাদেশ জাতীয় জোটের চেয়ারম্যান সেকান্দার আলী মনি মানবকণ্ঠকে বলেন, যে ২১ দল আমাদের জোট থেকে চলে গেছে, তারা মূলত ইসলামী মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত দল। এ মহাজোটের দল ছিল ৩৪। এ জোটের চেয়াম্যান আবু নাসের মোহাম্মদ ফারুক আমাদের জোটেই রয়েছেন।

তিনি জানান, জোট গঠন করার সময়ে যে চুক্তি হয়, তাতে চার নেতা যুক্ত স্বাক্ষর করেন। এ চার নেতা হলেন, জাতীয় পার্টির পক্ষে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, ইসলামিক ফ্রন্টের পক্ষে এর চেয়ারম্যান মাওলানা এমএ মান্নান, ইসলামী মহাজোটের পক্ষে এর চেয়ারম্যান আবু নাসের মো. ফারুক ও বাংলাদেশ জাতীয় জোটের পক্ষে এর চেয়ারম্যান হিসেবে আমি সেকান্দার আলী মনি। এখন চুক্তি হয়েছে আমাদের চার দল ও জোটের পক্ষে আমাদের মধ্যে। এখন কোন দল চলে গেল সেটা হিসাব রেখে কোনো লাভ নেই।

চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, একইসঙ্গে নির্বাচন ও সরকার গঠন করার কথা রয়েছে এই চুক্তিতে।

এদিকে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে রাজনীতির মাঠে রয়েছে আলাদা বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (বিএনএ) বা বাংলাদেশ জাতীয় জোট। জোটটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে যাওয়ার সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে। নাজমুল হুদার জোটে রয়েছে বাংলাদেশ মানবাধিকার পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ লেবার ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল জার্নালিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ শ্রমিক পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় তফসিলি ফেডারেশন, বাংলাদেশ জনশক্তি পার্টি, বাংলাদেশ পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, জাগো বাঙালি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক পার্টি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল), বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএনডিপি), বাংলাদেশ পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ ৩১টি দল। তারা আওয়ামী লীগ জোটে যেতে না পারলে বিএনএর মাধ্যমেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে।

এ ছাড়া কয়েকটি ইসলামী দল পৃথক জোট করে নির্বাচনের কথা ভাবছে বলে জানা গেছে। কিন্তু তিন মাস আগে এ জোটেও ভাঙন ধরে। এ জোট ভেঙে সিকান্দার আলী মনির নেতৃত্বে একই নামে জোটটি এরশাদের নেতৃত্বাধীন ইউএনএ জোটে যোগ দেয়।

অন্যদিকে জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ বেশ কয়েকটি দল মিলে বিকল্প জোটের চিন্তাভাবনা চলছে। এ জোট আগামী নির্বাচনেও অংশ নিতে চায়। এ নিয়ে সম্প্রতি আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসায় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে পুলিশ বাধা দিলেও শেষ পর্যন্ত জোটের শীর্ষ নেতারা প্রায় ৩ ঘণ্টা বৈঠক করেন। জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য ছাড়াও নতুন এ জোটে অন্য দলগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও বাম মোর্চা। যদিও সিপিবি ও বাম মোর্চাগুলো পৃথক জোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্না সাংবাদিকদের জানান, এখনো জোটের আত্মপ্রকাশ হয়নি। শিগগিরই আরো একটি বৈঠকের পর নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার দাবি নিয়ে মাঠে থাকবে এ জোট। শেষ পর্যন্ত জোটের মাধ্যমেও আমরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন বাসদের সঙ্গে সাইফুল হকের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা একটি ঐক্য করেছে সম্প্রতি। খালেকুজ্জামানের দল বাসদ কয়েক বছর ধরেই আরেক বাম দল সিপিবির সঙ্গে জোটবদ্ধ। পাশাপাশি দল দুটি সম্প্রতি গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার সঙ্গে একজোট হয়েছে, যে মোর্চায় সাইফুল হকের দল রয়েছে।

২৯ আগস্ট আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে জোট গড়ার লক্ষ্যে থাকা মাহমুদুর রহমান মান্নার উদ্যোগে এক বৈঠকে যোগ দেন বাসদ সম্পাদক খালেকুজ্জামান ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক সাইফুল হক। তবে ওই বৈঠকে সিপিবির কোনো নেতাকে দেখা যায়নি।

বৈঠকের পর মান্না সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এটা স্রেফ চায়ের দাওয়াত। আমরা একটা ঐক্য করার চেষ্টা করছি, যেটা জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ না করলেও একটা ঐক্যপ্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল আছে। তার সঙ্গে বামমোর্চা, যেটা বাম ঐক্যও করেছে, তাদের সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচি কী কী হতে পারে, তার ওপর বিস্তারিত এই বৈঠকে আলোচনা করেছি।

বাসদ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেছিলেন, সিপিবি-বাসদের একটা ঐক্য আছে, আমাদের বামমোর্চার একটি ঐক্য আছে। উনারা নাগরিক ঐক্য, গণফোরামসহ বাকিরা আছেন। দেশের পরিস্থিতি কে কীভাবে ভাবছেন, এখন সেই ভাবনাটা জানার জন্য আমরা এই আলোচনায় বসেছিলাম।
ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় জোটের (বিএনএ) অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশে কৃষক-শ্রমিক পার্টির চেয়ারম্যান লায়ন সালাম মাহমুদ ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান ডা. কাজী ফারুক বাবুলের নেতৃত্বাধীন জোট যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। এ জোটে রয়েছে ৩৫টি দল। এ জোট এরশাদের নেতৃত্বাধীন ইউএনএ জোটে যোগ দেয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানান এ জোটের চেয়ারম্যান সালাম মাহমুদ।
তিনি বলেন, এরশাদের সঙ্গে আমাদের এ নিয়ে বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়েছে। এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি জানান, বিএনএ জোট থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তার দল পদত্যাগ করেনি।

এদিকে সম্প্রতি নামসর্বস্ব হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান আদিবাসী পার্টিসহ কয়েকটি সংগঠনের বাংলাদেশ জনতা পার্টি (বিজেপি) নামের একটি দল গঠিত হয়েছে। দলটি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ারও ঘোষণা দিয়েছে; যদিও রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনে বিজেপির নিবন্ধন নেই।

বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সংবাদ সম্মেলনে রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা করা হয়। ২০১৪ সালে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান আদিবাসী পার্টি গঠিত হয়। এদের উদ্যোগে আরো কিছু সংগঠন নিয়ে বিজেপি আত্মপ্রকাশ করল। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান আদিবাসী পার্টি ছাড়াও এই দলে আছে মুক্তির আহ্বান, বাংলাদেশ সচেতন সংঘ, জাগো হিন্দু পরিষদ, আনন্দ আশ্রম, হিন্দু লীগ, সনাতন আর্য সংঘ, বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন, বাংলাদেশ ঋষি সম্প্রদায়, বাংলাদেশ মাইনরিটি ফ্রন্ট, হিউম্যান রাইটস, হিন্দু ঐক্য জোটসহ বিভিন্ন সংগঠন।

দলের সভাপতি ও মুখপাত্র হয়েছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান আদিবাসী পার্টির সভাপতি মিঠুন চৌধুরী, মহাসচিব দেবাশীষ সাহা। মহানগর সম্পাদক হয়েছেন দেবদুলাল সাহা। আর দলের যুব পার্টির সভাপতি আশিক ঘোষ।

এরই দু’দিন পর আরো একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটল। নতুন এই দলটির নাম বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি)। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্সে লাউঞ্জে এক সংবাদ সম্মেলনে একটি ‘পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল’ হিসেবে বিএমজেপির আত্মপ্রকাশ ঘটে। ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বাঁচাও, জয় মানবতার জয়- এই স্লোগান নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা দলটি আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেবে বলে জানিয়েছে।

দলের সভাপতি শ্যামল কুমার রায় আর সাধারণ সম্পাদক হলেন সুকৃতি কুমার মণ্ডল। নতুন এই দল গঠনের আগে শ্যামল কুমার বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের প্রধান সমন্বয়কারী ও সুকৃতি কুমার মণ্ডল একই সংগঠনের নির্বাহী সভাপতি ছিলেন।

মানবকণ্ঠ/বিএএফ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সরকারেই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে সংবিধান

Sharing is caring!FacebookTwitterGoogle+Pinterestসংবিধানকে প্রতিপাদ্য করে নিজেদের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকারের ...