Home » সারাদেশ » টানা বৃষ্টিতে দুর্ভোগে রোহিঙ্গারা পাহাড় ধসে প্রাণহানির আশঙ্কা

টানা বৃষ্টিতে দুর্ভোগে রোহিঙ্গারা পাহাড় ধসে প্রাণহানির আশঙ্কা

দুইদিনের টানা বৃষ্টিতে উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়া চার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন। পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিতভাবে বসতি করার ফলে পাহাড় ধসের আশঙ্কাও করছেন স্থানীয়রা। টেকনাফ উপজেলার উনছিপ্রাং, উখিয়ার পালংখালী, বালুখালী, থাইংখালী ও কুতুপালং এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বসবাস করছেন।

টেকনাফ-উখিয়ায় গত শনিবার রাত থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে অসংখ্য রোহিঙ্গাকে অভুক্তই থাকতে হচ্ছে। তাছাড়া বৃষ্টির পানিতে ভিজে প্রায় রোহিঙ্গা বিশেষত শিশুরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। টানা বৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের ঝুপড়ির সব কিছুই ভিজে এবং কাদামাটিতে একাকার হয়ে পড়েছে। খাবার-বিশুদ্ধ পানির চরম সংকটের মধ্যে টানা বৃষ্টি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও থেমে নেই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ। টেকনাফ-উখিয়া সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দলে দলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে। বিশেষ করে বেশি আসছে শাহপরীরদ্বীপ পয়েন্ট দিয়ে।

ভিজে একাকার অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা জানান, সহায়-সম্বল ফেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে মৃত্যু, আতঙ্ক, গুলি, জবাই, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ইত্যাদি উপেক্ষা করে মাইলের পর মাইল হেঁটে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পৌঁছুতে পেরে আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি। কিন্তু দুর্গতি যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। এখনো মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি। অর্ধাহারে অনাহারে সকলেরই কাহিল অবস্থা। তার ওপর গত কয়েক দিন ধরে টেকনাফ ও উখিয়ায় থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে ভোগান্তি আরো বেড়েছে। যারা অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র আশ্রয় নিয়েছে তারাও শান্তিতে নেই। বৃষ্টিতে ঝুপড়ি ঘরের সব কিছু ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। পাহাড়ের আঠালো কাদামাটিতে কাপড়-চোপড়, ঘুমানোর বিছানাসহ সব কিছু ভিজে এবং কাদামাটিতে একাকার হয়ে পড়েছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণভাবে ছোট-বড় পাহাড় কেটে তাতে বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে ঘর তৈরি করে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা। সারি সারি ঘর তুলে তারা পাহাড় ধসের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলেছে। এভাবে পরিকল্পিতভাবে ঘর তৈরির ফলে যে কোনো সময় পাহাড় ধসের আশঙ্কা করছেন। বালুখালী ও উনছিপ্রাং এলাকায় কয়েকটি উঁচু পাহাড়ে রোহিঙ্গারা ঝুঁকিপূর্ণ ঘর তৈরি করেছে। কোনো পাহাড়ে একটুও ফাঁকা জায়গা নেই।

‘এই পাহাড়গুলো এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ, তার ওপর এই বৃষ্টিতে আরো ঝুঁকিপূর্ণ হলো। যারা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে, আমরা তাদের জন্য চিন্তিত।

টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ বলেন ‘বহু মানুষ মিয়ানমার থেকে ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত অবস্থায় এবং কোনো খাদ্য বা পানি ছাড়াই এসে পৌঁছাচ্ছে। এত বেশি সংখ্যক আশ্রয় নিয়েছে যাদের সবার খাদ্য, আশ্রয়, খাবার পানি এবং মৌলিক পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিবারগুলো তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে না পারলে দুর্ভোগ আরো অনেক বাড়বে এবং এতে প্রাণহানি ঘটারও আশঙ্কা রয়েছে’।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. সুমন বড়–য়া বলেন ‘অস্থায়ী রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে মেডিকেল কার্যক্রম ব্যাপকভাবে শুরু করা হয়েছে। শিশুদের জন্য বিশেষ ইপিআই কর্মসূচির অধীনে ইপিআই এবং মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া একদিন থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুকে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় আনাসহ শিশুদের হাম-রুবেলা টিকা প্রদান এবং পোলিও টিকা দেয়া হচ্ছে। শনিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম উখিয়ার বালুখালী ও কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে গেছেন। এ সময় তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোতে মেডিকেল টিম স্থাপনসহ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু করতে নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনা মোতাবেক ডাক্তার-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব বণ্টন অনুসারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

এদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড় ধসের মতো ঘটনা ঘটলে তা সামলানোর প্রস্তুতি নেই। তারা বলেন, পাহাড়গুলো এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। তার ওপর সেগুলো কাটা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। বৃষ্টিতে এই ঝুঁকির মাত্রা আরো বেড়েছে। এতে ধস হওয়ার বেশি সম্ভাবনা থাকে। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছি, যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ধস হলে আরো বড় দুর্যোগ দেখা দেবে। তবে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। এতো মানুষকে একই সঙ্গে বুঝিয়ে-শুনিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা কঠিন। তারপরও জেলা প্রশাসন ও সেবাদান প্রতিষ্ঠানগুলো চেষ্টা করছে।

গত শনিবার থেকে বৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দ্বিগুণ হয়েছে। পাহাড়ের ঢালে যারা ঘর তৈরি করেছেন বৃষ্টিতে তাদের অনেকের ঘর তলিয়ে গেছে। তারা রাস্তায় এসে আশ্রয় নিয়েছে। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস এ সপ্তাহের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানিয়েছে, বুধ ও বৃহস্পতিবার জেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। শুক্রবার বৃষ্টি কমতে পারে। তবে আকাশ মেঘলা থাকবে। এরপর ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

গড়ছে ভাঙছে দল ও জোট

Sharing is caring!FacebookTwitterGoogle+Pinterestএকাদশ সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নতুন নতুন দল ও জোট গঠন ...