Home » সারাদেশ » দল ও নির্বাচনকে ঘিরে আসছে বিএনপির ‘ক্রাশ কর্মসূচি’

দল ও নির্বাচনকে ঘিরে আসছে বিএনপির ‘ক্রাশ কর্মসূচি’

আগামী একাদশ নির্বাচনকে ঘিরে ত্বরিত ফল পেতে কিছু ‘জরুরি-ক্রাশ কর্মসূচি’ নেয়ার চিন্তা করছে বিএনপি। সংগঠনকে ‘গতিশীল’ ও আসছে নির্বাচনকে ‘সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ’ করতে এ কর্মসূচি তৈরির পরিকল্পনার কথা ভাবছে দলটি। দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া লন্ডনে যাওয়ার পরই এমন নির্দেশনা পাওয়া গেছে। তিনি দেশে ফেরার পরই এ কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা গেছে।

দলের একটি সূত্র জানায়, বিএনপি ‘ত্বরিত ফললাভের’ জন্য দু’ভাবে এই জরুরি-ক্রাশ কর্মসূচি প্রণয়নের চিন্তা করছে। এর একটি হবে সংগঠনকে ঘিরে এবং অন্যটি হবে আগামী নির্বাচনকে কীভাবে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু করা যায় তাকে ঘিরে। সংগঠনকে আগামী নির্বাচনে উপযোগী করতে ইতিমধ্যে দুটি কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এর একটি হলো কেন্দ্র থেকে গঠন করে দেয়া ৫১ কমিটির নেতৃত্বে সারাদেশে সভা-সমাবেশ ও উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে দলের সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব তুলে ধরা। দ্বিতীয় হলো নতুন সদস্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক সদস্য পদ নবায়ন।

দলের সূত্রে জানা গেছে, ৫১ কমিটির উদ্যোগে তৃণমূল পর্যায়ে সভা-সমাবেশ ও উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে যেমন ভাল ফল লাভ হয়েছে, তেমনি কিছুটা খারাপও হয়েছে। প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও এই সভা-সমাবেশের মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর তৃণমূল নেতাকর্মীরা একত্রিত হতে পেরেছে। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মতবিনিময় করতে পেরেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে দলের সমস্যা তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু এ সভা-সমাবেশের মাধ্যমেই তৃণমূলের মধ্যে ভয়াবহ আকারে অন্তঃকোন্দলও যে রয়েছে তা প্রকাশ্য হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে দলের বেশ কয়েক জন কেন্দ্রীয় নেতা মানবকণ্ঠকে জানান, ওই সভা-সমাবেশের মাধ্যমে অন্তঃকোন্দল, অন্তঃবিরোধ প্রকাশ্য হয়ে পড়ায় সংগঠনের জন্য ভালই হলো। এখন সংগঠন এমন একটি ‘ক্রাশ কর্মসূচি’ নিতে চায়, যে কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ওই অন্তঃকোন্দল যেন মিটে যায়।

কী ধরনের ক্রাশ কর্মসূচি নেয়া হতে পারে জানতে চাইলে তারা জানান, ক্রাশ কর্মসূচি নেয়ার নির্দেশনা এসেছে মাত্র। এখন কোনো কিছুই চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে বেগম জিয়া লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পরই কেবল এ কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে।

এদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আকাঙ্ক্ষিত ফললাভ না করায় বিএনপি তার সদস্য সংগ্রহ অভিযান ও প্রাথমিক সদস্য পদ নবায়নের সময় আরো একমাস বাড়িয়েছে। এ ব্যাপারে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে আমাদের দলের সদস্য সংগ্রহ অভিযানের চূড়ান্ত টার্গেট ব্যাহত হয়েছে। ইতিমধ্যে, লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকের বেশি আমরা অর্জন করেছি। এজন্য দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ কর্মসূচি আরো এক মাস অর্থাৎ আগামী ১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাথমিক সদস্যপদ নবায়ন ও নতুন সদস্যপদ গ্রহণের কার্যক্রম বাড়ানো হলো।

উল্লেখ্য, ১ জুলাই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দলের সদস্য সংগ্রহের দুই মাসব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। ১ সেপ্টেম্বর এ কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা ছিল। এক কোটি সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার কথা কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া।

বিএনপির দফতর শাখা থেকে জানা যায়, এ পর্যন্ত ৬০ লাখ ৫৬ হাজার ফরম বিক্রি হয়েছে। প্রতিটি ফরমের দাম রাখা হয়েছে ১০ টাকা। সেই হিসেবে ৬ কোটির কিছু বেশি অর্থ বিএনপির তহবিলে জমা পড়েছে। উত্তরাঞ্চলসহ ২৭টি জেলায় ব্যাপক বন্যার কারণে সদস্য সংগ্রহের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান বিএনপির একাধিক নেতা।

বিএনপির নেতারা মনে করেন, সদস্য সংগ্রহ অভিযানে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দলের একটি গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। আবার অন্যদিকে দলের তহবিলেও মোটা অংকের অর্থযোগ হবে। এ তহবিল আগামী নির্বাচনে ব্যাপক কাজ দেবে বলে মনে করেন তারা।

অন্যদিকে আগামী একাদশ নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে কী করা যায়, এ নিয়ে প্রায় গবেষণা করছে দলটি। লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পরই বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রুপরেখা উপস্থাপন করার কথা রয়েছে। চলতি মাসের ১৫ তারিখই তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু আরো ফলোআপ চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে আরো বেশকিছু দিন থাকতে হচ্ছে। চিকিৎসার ফাঁকে ফাঁকে দলের আরেক শীর্ষ নেতা তারই পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে আগামী নির্বাচন নিয়ে মতবিনিময় করেছেন বলে জানা গেছে। ওই মতবিনিময়ে আগামী নির্বাচনকে কীভাবে সুষ্ঠু করা যায়, সে প্রসঙ্গে তারেক রহমান বেশকিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শও দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে সে পরামর্শ কী তা এখনই বিএনপি নেতারা খোলাশা করে বলছেন না। তারা জানান, আমরাই এ ব্যাপারে ‘অনবিহিত’ রয়েছি। তবে এতটুকু জানি যে, বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশে ফিরলে ব্যাপকভিত্তিক কিছু কর্মসূচি নেয়া হবে।

তবে বিএনপি যে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার নিয়ে অনড় নয় তা ইতিমধ্যেই খোলাশা করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ইতিমধ্যে বলেছেন যে, তারা নির্বাচনকালীন সত্যিকার অর্থে একটা নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার চান। তবে এটা কিন্তু অনড় (রিজিড) ব্যাপার নয়। তারা এ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে আলোচনা করতে চান, সমঝোতা করতে চান। তারা সব সময় আশা করেন, সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।

মির্জা ফখরুল তার এ বক্তব্যটি রেখেছিলেন ঈদোত্তর সময়ে সাংবাদিকরা তার উত্তরার বাসায় যাওয়ার পর। কিন্তু এর পর দলের ৩৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন আদায় করে নিতে হবে। এদেশে নির্বাচন অবশ্যই হবে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হবে। সে নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

এর পাশাপাশি নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে নির্বাচনকালে যে সরকার থাকবে তার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাকে মানবে না তারা। এজন্য সেই সময়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়ার দাবি তুলবে তারা। কিন্তু এমন সম্ভাবনা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ একেবারেই নাকচ করে দিয়েছে।

সর্বশেষ গত কয়েকদিন আগে হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দলের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, আগামী সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবে। আমরা সেটা নিশ্চিত করব। এটা নিয়ে অহেতুক পানি ঘোলা করার চেষ্টা করা, আর সংবিধান লঙ্ঘন করে অন্য কিছু করার সুযোগ নেই।

ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন যে, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রধান থাকবেন শেখ হাসিনা। এর কোনো অন্যথা হবে না।

এ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচনের সময় আরো এগিয়ে এলে আমাদের বক্তব্যের প্রভাব কতটুকু পড়ছে দেশে-বিদেশে, আন্তর্জাতিক বিশ্বে, তার ওপরে নির্ভর করবে যে, উনারা (সরকার) কিভাবে চিন্তা করছেন।

তবে বিএনপির একটি সূত্র অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন কীভাবে হবে তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে দলের যোগাযোগ চলছে। এ নিয়ে আড়ালে-আবডালে চলছে আলোচনা। একটি প্রাথমিক সমঝোতা হলেই কেবল এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখা হবে। দেশের এই ‘দুই শক্তির’ সমঝোতার জন্য অবশ্য বাইরের কয়েকটি দেশও জড়িত রয়েছে বলে ওই সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।

আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে এসব প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিএনপি আর কী ধরনের কর্মসুচি নিতে পারে জানতে চাইলে দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানবকণ্ঠকে জানান, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। বাইরের বিশ্বে তাদের তেমন গ্রহণযোগ্যতা নেই। এজন্য আওয়ামী লীগ একটি ‘গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচন চায়। তেমনিভাবে বিএনপি প্রায় ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে। এ দলের নেতানেত্রী-কর্মীরা মামলা হামলায় ব্যাতিব্যস্ত। তাই আগামী নির্বাচন কীভাবে হবে তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে একটি সমঝোতা চায় বিএনপি। দলের মহাসচিব ঈদের পর এক ব্রিফিং-এ ইতিমধ্যে তা পরিষ্কার করেছেন। এখন দেখার বিষয় আওয়ামী লীগ এটাকে কিভাবে নেয়।

তিনি বলেন, যদি আওয়ামী লীগ ‘গো’ ধরে থাকে তাহলে আমাদের বিকল্প পথ ভাবতে হবে।

এ ব্যপারে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, তারা প্রথম চান, আগামী নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সমঝোতা। এজন্য দুই দলের মধ্যে সংলাপ-আলাপ আলোচনাকে বিএনপি প্রাধান্য দেয়। কিন্তু তা যদি না হয় তাহলে আন্দোলন করা ছাড়া তাদের কাছে বিকল্প কিছু থাকবে না।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

গড়ছে ভাঙছে দল ও জোট

Sharing is caring!FacebookTwitterGoogle+Pinterestএকাদশ সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নতুন নতুন দল ও জোট গঠন ...