Home » অর্থ-বাণিজ্য » বাড়ছে গ্রাহক, বাড়ছে ব্যবসা
14

বাড়ছে গ্রাহক, বাড়ছে ব্যবসা

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মেহরাব হোসেন সদ্য বিবাহ করেছেন। ব্যাচেলর জীবন ছেড়ে বউসহ উঠেছেন ভাড়া বাসায়। বাসায় আসবাব কিছু নেই বললেই চলে। নতুন সংসারের জন্য একটা আলমারি ও ফ্রিজ খুবই দরকার। হাতে কোনো জমানো টাকা নেই, তাই মেহরাবের কাছে ক্রেডিট কার্ড যেন হয়ে উঠেছিল একমাত্র সম্বল।

এ রকম অনেক চাহিদার কারণেই বাংলাদেশেও দিনে দিনে ক্রেডিট কার্ড হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার অন্যতম অনুষঙ্গ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, দেশের নয় লাখের বেশি মানুষের কাছে রয়েছে ব্যাংকের এ সেবা পণ্যটি। চাহিদা বাড়ছে, তাই গ্রাহক বাড়াতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে রীতিমতো চলছে প্রতিযোগিতা। এতে একদিকে বাড়ছে গ্রাহক, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর মুনাফাও বাড়ছে এ সেবা থেকে।

তবে ক্রেডিট কার্ডের সুদ হার নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে মাঝেমধ্যে কিছুটা অসন্তুষ্টি দেখা যায়। এ জন্য সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডে সুদ হার বেধে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ক্রেডিট কার্ডের সুদ হার হবে ব্যাংকের অন্য যেকোনো ঋণের সুদের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ সুদ হার কার্যকর হবে।

ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকেরা নির্দিষ্ট পরিমাণ কেনাকাটা ও ঋণ নিতে পারেন। সময়মতো পরিশোধ করলে এর বিপরীতে কোনো সুদ দিতে হয় না। এ ছাড়া বিদেশে কেনাকাটা, খাওয়া, থাকা, ভ্রমণে মিলছে বিশেষ সুবিধা।

বাংলাদেশে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন এএনজেড গ্রিন্ডলেজ (বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড) ব্যাংক প্রথম ক্রেডিট কার্ড সেবা নিয়ে আসে। কাছাকাছি সময়ে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক ও তৎকালীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভানিক বাংলাদেশ (বর্তমানে লংকাবাংলা ফাইন্যান্স) এ সেবা চালু করে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অন্য ব্যাংকগুলোও এ সেবায় মনোযোগী হয়। বর্তমানে দেশের ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ৩৯টি ব্যাংকে এ সেবা রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় দেড় শ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে দেশের বাইরে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ক্রেডিট কার্ড ব্যবসায় নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশীয় মালিকানার দি সিটি ব্যাংক। ব্যাংকটির ৩ লাখ ১৬ হাজার ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকান এক্সপ্রেস (অ্যামেক্স) ব্র্যান্ডের ২ লাখ ২৩ হাজার ও ভিসা ব্র্যান্ডের ৯৩ হাজার। অ্যামেক্স কার্ডের কারণে ব্যাংকটি এ সেবায় এগিয়ে রয়েছে। বাজারে ব্যাংকটির রয়েছে ১৪ হাজার পয়েন্ট আব সেলস বা পিওএস মেশিন।

সিটি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন বলেন, ক্রেডিট কার্ড এখন আর কোনো বিলাস পণ্য নয়। নির্দিষ্ট আয়ের সবার কাছেই ক্রেডিট কার্ড থাকতে পারে। এ কার্ড দিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় কেনাকাটা থেকে শুরু করে ঘোরাঘুরি করেও নানা ছাড় পাবেন।

মাশরুর আরেফিন বলেন, একটি ক্রেডিট কার্ড যে কাউকে নতুন মর্যাদা দিচ্ছে। কার্ডের কারণে বিমানবন্দরে বিশেষ লাউঞ্জ সুবিধা পাচ্ছে, হোটেল-মোটেলে থাকা-খাওয়ায় বিশেষ ছাড় পাচ্ছে। এমনকি দেশের বাইরের বিমানবন্দর ও হোটেলেও মিলছে এসব সুবিধা। এসব কারণে ক্রেডিট কার্ড এখন জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনছে।

সুদের হার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে-বিদেশে ভ্রমণ, কেনাকাটা, রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকেরা নানা ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকেন। এসব কারণে ক্রেডিট কার্ডের সুদ হার একটু বেশি।

বাজারে প্রায় দেড় লাখ ক্রেডিট কার্ড রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ও ইস্টার্ণ ব্যাংকের। ব্র্যাক ব্যাংকের রয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার কার্ড। লংকাবাংলার রয়েছে ৭০ হাজার ক্রেডিট কার্ড।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান আদিত্য মণ্ডল বলেন, ‘শুরু থেকেই গ্রাহকসেবায় নতুনত্ব নিয়ে আসার জন্য আমরা রিওয়ার্ড পয়েন্টস, কার্ড চেক এবং কেনাকাটায় মাসিক কিস্তিসহ বিভিন্ন সুবিধা চালু করেছি। বাংলাদেশে আমরাই প্রথম ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড (সাদিক) চালু করি। সম্প্রতি বাজারে সুপার ভ্যালু টাইটেনিয়াম এবং গ্রামীণফোন কো-ব্র্যান্ড ক্রেডিট কার্ড চালু করেছি, যা ইতিমধ্যে গ্রাহকদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।’

বাজারে ব্যাংক এশিয়ার প্রায় ৬০ হাজার ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। ব্যাংকটির রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান আরিফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তবে এসব কার্ডে ঝুঁকি বেশি হওয়ায় প্রবৃদ্ধি সেভাবে হচ্ছে না। খেলাপির হার বেশি হওয়ায় অনেক ব্যাংক এ ব্যবসায় আগ্রহী দেখাচ্ছে না। আমরাও খুব বাছাই করে গ্রাহকদের এ কার্ড দিচ্ছি।’

আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতিমালা দিয়েছে তাতে কার্ড ব্যবসা খুব কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে যেভাবে চলছে, সারা বিশ্বেই কার্ড ব্যবসা এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রাইম ব্যাংকের প্রায় ৫০ হাজার ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। ব্যাংকটির কার্ড বিভাগের প্রধান আমির হোসেন মজুমদার বলেন, সারা বিশ্বেই ক্রেডিট কার্ডের ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। ক্রেডিট কার্ডের জন্য বাংলাদেশও একটি সম্ভাবনাময় বাজার। ব্যাংকগুলোও সেভাবে অগ্রসর হচ্ছে।

আমির হোসেন বলেন, ‘যাঁদের করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন সার্টিফিকেট রয়েছে, আমরা তাঁদেরই গ্রাহক করার চেষ্টা করি। এতে করে কার্ডে লেনদেনের প্রভাব পড়ে রাজস্ব আয়েও।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুনে দেশে ক্রেডিট কার্ড ছিল ৯ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৮টি। আগের বছরের জুনে এ সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ১ হাজার ৬২৪। অর্থাৎ এক বছরে ক্রেডিট কার্ড বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫২৪টি। এসব কার্ডের মাধ্যমে গত জুনে লেনদেন হয়েছে ৮৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এটিএম থেকে উত্তোলন হয়েছে ৭৮ কোটি টাকা, পিওএসে লেনদেন হয়েছে ৬০৯ কোটি টাকা এবং ই-কমার্সে কেনাকাটা করা হয়েছে ১৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দেশের বাইরে এটিএম থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ১৫ কোটি টাকা, পিওএসে লেনদেন হয়েছে ৯৮ কোটি টাকা এবং ই-কমার্সে কেনাকাটা করা হয়েছে ৩৬ কোটি টাকার। গত জুন পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডে ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।

যাঁরা পাবেন

* ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে যে কেউ

* জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে

* মাসিক আয় ২০ হাজার টাকার বেশি

* কমপক্ষে ৬ মাস ব্যাংক হিসাবেবেতন পেতে হবে

* ব্যবসায়ী হলে নির্দিষ্ট আয়ের ব্যাংক তথ্য থাকতে হবে

পরামর্শ

* মুঠোফোনে কার্ডের তথ্য দেখুন

* বিল ভালোভাবে যাচাই করুন

* বিল পরিশোধের শেষ তারিখ মনে রাখুন

* কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে হিসাব রাখুন

* সে অনুযায়ী সুদ দেওয়ার প্রস্তুতি নিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

15

যেভাবে যাত্রা শুরু ক্রেডিট কার্ডের

Sharing is caring!FacebookTwitterGoogle+Pinterest ১৯৪৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি রেস্তোরাঁয় নৈশভোজ করতে গিয়েছিলেন ফ্রাঙ্ক ম্যাকনামারা নামে ...