Home » শীর্ষবার্তা » বেতাগীর মানুষ ক্ষুব্ধ, স্তম্ভিত
5

বেতাগীর মানুষ ক্ষুব্ধ, স্তম্ভিত

বরগুনার বেতাগী উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষককে স্কুলেরই একটি কক্ষে স্বামীর সামনে ধর্ষণের ঘটনার আলামত মিলেছে ডাক্তারি পরীক্ষায়। তবে এ ঘটনায় ছয় আসামির কেউ ধরা পড়েননি। তাঁরা এলাকায় প্রভাবশালী এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত।

আসামিদের না পেয়ে পুলিশ দুই আসামির বাবাদের আটক করেছে। তাঁরা হলেন আসামি রাসেলের বাবা আবদুল হাকিম ও সুমন কাজীর বাবা আবদুল কুদ্দুস কাজী।

গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ের কক্ষে শিক্ষকের ওপর এই বর্বর নির্যাতনের ঘটনায় এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ, স্তম্ভিত। গতকাল শনিবার ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কম ছিল। পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেছে, ‘ওই ঘটনার পর থেকে স্কুলে যেতে ভয় লাগছে।’ এলাকার লোকজন বলছেন, এ ঘটনায় তাঁরা লজ্জিত, ক্ষুব্ধ।

ওই শিক্ষক ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন। তাঁরা ভয়ে মামলা চালাতেও চাইছেন না। তাঁদের নিরাপত্তায় বিদ্যালয়ে ও বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, শুক্রবার বিকেলে ওই স্কুলশিক্ষকের ডাক্তারি পরীক্ষা হয় বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে। গাইনি বিভাগের চিকিৎসক আজমিরি বেগম প্রথম আলোকে বলেছেন, পরীক্ষায় সম্ভবত ধর্ষণের আলামত মিলেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন দিতে আরও এক-দুদিন সময় লাগবে।

গতকাল দুপুরে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল মজিদ বিদ্যালয়ে গিয়ে ওই শিক্ষকের লিখিত জবানবন্দি নিয়েছেন। এর আগে জেলা মহিলা পরিষদের নেতারাও বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেন।

জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি নাজমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়েটির সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানায়। ওর মুখে ঘটনার বর্ণনা শুনে আমরা স্তব্ধ। আমরা এর কঠোর শস্তি চাই।’

নির্যাতনের শিকার ওই শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে যা হয়েছে, তা যেন আর কোনো মেয়ের সঙ্গে না হয়। ওরা অনেক বড় সন্ত্রাসী। আমার পরিবার চায় না আমি ওদের বিরুদ্ধে মামলা লড়ি। আমার স্বামী চান তাঁর সঙ্গে ভারতে চলে যাই। আমি যেতে রাজি হইনি বলে তিনি আজ (শনিবার) সকালে চলে গেছেন। কী করব ভেবে পাচ্ছি না।’ তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীকে বেদম মারধর করেছে। এরপর ওরা আমার স্বামীকে চেয়ারে বসিয়ে দুজনে চেপে ধরে রাখে, তাঁর সামনেই ওরা আমাকে নির্যাতন করেছে।’

আসামিরা সন্ত্রাসী ঘটনায় জড়িত

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলার ছয় আসামি সুমন বিশ্বাস (৩৫), রাসেল (২৪), সুমন কাজী (৩০), মো. রবিউল (১৮), হাসান (২৫) ও মো. জুয়েল (৩০) বৃহস্পতিবার বিকেলেই এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দেন। এলাকার লোকজন জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই ছেলেরা এলাকায় নেশাদ্রব্য বিক্রি ও সেবন এবং সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে জড়িত। সুমন বিশ্বাস স্থানীয় হোসনাবাদ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রভাবশালী ইউপি সদস্য মন্টু বিশ্বাসের চাচাতো ভাই এবং তাঁর মোটরসাইকেলের চালক। আওয়ামী লীগে কোনো পদ-পদবি না থাকলেও মন্টু বিশ্বাস এলাকায় সরকারি দলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তিনি বেতাগী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি বাবুল আকতারের খালাতো ভাই। মূলত মন্টু বিশ্বাসের মদদেই সুমন ও তাঁর সহযোগীরা নিজেদের আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের কর্মী পরিচয়ে হোসনাবাদ ইউনিয়নে নানা অপকর্ম করে বেড়ান। তাঁদের ভয়ে এলাকার লোকজন মুখ খোলার সাহস পর্যন্ত পায় না।

গতকাল সকালে হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা এলাকায় গিয়ে মন্টু বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। বাবুল আকতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মন্টু বিশ্বাস আমার খালাতো ভাই এটা ঠিক। তবে সে অতটা খারাপ লোক না, পড়াশোনা কম হলে যা হয় আর কি। তবে সুমন বিশ্বাস মন্টুর চাচাতো ভাই এবং মোটরসাইকেলের চালক এটা ঠিক। সুমন ও তার সহযোগীরা এলাকায় এহেন খারাপ কাজ নেই, যা করে না।’

ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মান্নান বলেন, ‘সুমন ২০১৫ সালে আমার ছেলে আইজুল ইসলামের চোখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করে। এ ঘটনায় মামলা করেছিলাম। এরপর এলাকায় অনেক সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটিয়েছে সে।’

স্থানীয় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের এক চালক বলেন, হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা ও ফুলতলা দুটি বাজারের সব ধরনের অপকর্মের হোতা এই সুমন ও তাঁর সহযোগীরা। যে স্কুলে বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনা ঘটে, ওই স্কুলে প্রতিদিন রাতে ইয়াবা ও গাঁজার আসর বসান তাঁরা।

পার্শ্ববর্তী মোকামিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য দেলোয়ার হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার নির্যাতনের ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি ইউপি সদস্য মন্টু বিশ্বাস, সুমন বিশ্বাসসহ অন্যদের দেখেন। সুমন ও তাঁর সহযোগীরা শিক্ষককে বর্বর নির্যাতন ও তাঁর স্বামীকে মারধর করার পর বিদ্যালয়ের কলাপসিবল গেটের চাবি জোর করে এনে তাঁদের তালাবদ্ধ করে আটকে রেখে লোকজন জড়ো করেন। ঘটনা শুনে এর প্রতিবাদ করলে সুমন ও তাঁর সহযোগীরা দেলোয়ারকেও মারধর করার জন্য উদ্যত হন এবং শাসান। এরপর মন্টু বিশ্বাস চাবি দিয়ে তালা খুলে শিক্ষক ও তাঁর স্বামীকে বের করে বাইরে আনেন। তখন তাঁদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। দেলোয়ার বলেন, ‘আমরা তাঁদের ইউএনওর কাছে নিয়ে যাই। পরে ইউএনওর পরামর্শে থানায় নিয়ে গেলে পুলিশ স্কুলশিক্ষককে হাসপাতালে ভর্তি করে।’

দেলোয়ার বলেন, সুমন ও তাঁর সহযোগীরা এলাকায় ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করেছেন। তাঁদের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।

শিক্ষককে ধর্ষণের ঘটনার পর শুক্রবার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি তিন দিনের কালো ব্যাজ ধারণ ও মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করলেও অনিবার্য কারণে গতকাল তা পালন করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান বলেন, বিষয়টি শিক্ষা বিভাগ তদন্ত করছে। নিশ্চিত হওয়ার পর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

বেতাগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মামুন অর রশিদ বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে। গতকাল দুই আসামির দুই বাবাকে আটক করা হয়েছে। পরিবারটির নিরাপত্তায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ee

হাঁকডাক দিয়ে ইলিশ বিক্রি

Sharing is caring!FacebookTwitterGoogle+Pinterestপটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় রাবনাবাদ নদ ও বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। ...