Home » আন্তর্জাতিক » ভয়ংকর সুন্দর ডেথ ভ্যালি

ভয়ংকর সুন্দর ডেথ ভ্যালি

পর্যটনের নেশা আশৈশব। একেবারে নিরেট সমতলে জন্ম ও বেড়ে ওঠায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য পাহাড় ও সমুদ্রের প্রতি ঝোঁক সব সময়ই খুব বেশি ছিল ও আছে। তাই উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর থেকেই সারাক্ষণ সময় ও সঙ্গী-সাথি খুঁজে বেড়াই ঘুরে বেড়ানোর জন্য। এই গ্রীষ্মের বন্ধেও তেমনই এক সুযোগ তৈরি হয়ে গেল।
মূল লক্ষ্য প্রকৃতির বিরল বিস্ময় ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ ভ্রমণ। যাত্রা শুরু নিউ অর্লিন্স থেকে লাস ভেগাস শহরের আকাশপথে। ইউনিভার্সিটি অব নিউ অর্লিন্সের ৫ জন বাংলাদেশি ছাত্রের গ্রুপ যখন লাস ভেগাস ম্যাক-কারান এয়ারপোর্টে নামলাম, এয়ারপোর্টের টার্মিনালে শুরুতেই ক্যাসিনোর বাহার বলে দিলো এটা জুয়ার শহর। বের হতেই প্রচণ্ড দাবদাহ। তাড়াহুড়ো করে শাটল ধরে রেন্টাল কার স্টপেজে গেলাম। আগে থেকেই অনলাইনে ভাড়া করা গাড়ি বুঝে নিয়ে খুঁজে নিলাম সি-ফুড বাফে। রাতের খাবার শেষ করেই যাত্রা শুরু উটাহ ও অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের মাঝামাঝি মনুমেন্ট ভ্যালি।
জ্যোৎস্নার সঙ্গে আমার ভ্রমণ সময়ের কাকতালীয় সান্নিধ্য আছে। রুয়েটে পড়ার সময় ঢাকা থেকে রাজশাহী ট্রেনযাত্রার বেশির ভাগ দিনও ছিল জ্যোৎস্নায় ভরা। এবারেও ব্যতিক্রম নয়, চাঁদের মোহনীয় আলোয় অনাবিল পাহাড় পাশে রেখে ছুটে চলা আর গাড়ির প্লেয়ারে চলছে প্রিয় সব বাংলা গান। তেল নেওয়া ও প্রয়োজনীয় কফি ব্রেক বাদে দ্রুততার সঙ্গেই চলল সারা রাতের যাত্রা। লক্ষ্য সূর্যোদয়ের আগেই মনুমেন্ট ভ্যালিতে পৌঁছানো। সূর্যোদয়ের ১০-১৫ মিনিট আগে পৌঁছালাম উইন্ডোজ ভিসতার সেই মোহনীয় ওয়ালপেপারের জায়গা ‘মনুমেন্ট ভ্যালি’তে।
মন ভরে সূর্যোদয় দেখে ছবি তুলে আবার রওনা দিলাম কিছুদূর ফিরতি পথে। মুভিতে শুধু অ্যারিজোনা ও উটাহর বর্ডারের রাস্তা দেখেছি, কিন্তু চোখে দেখার পরে সারা রাতের ভ্রমণের ক্লান্তি নিমেষে উধাও। সময় সংরক্ষণে গাড়ির মধ্যেই কিছু পাউরুটি-কলার নাশতা সেরে পরবর্তী গন্তব্য অ্যান্টিলোপ ক্যানিয়নে। পাহাড়ের শৈল্পিক গুহায় আলো-ছায়ার যে কী বর্ণিল সমন্বয় তা কিছুটা আন্দাজ করতে পারবেন যে কেউই Antelope Canyone লিখে গুগলে সার্চ দিলেই। প্যাকেজ নিয়ে খোলা জিপে ধুলো ওড়া পথে স্বর্ণকেশি শ্বেতাঙ্গ সুন্দরীদের সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে গেলাম গুহার রাজ্য অ্যান্টিলোপ ক্যানিয়নে। কারও যদি ফটোগ্রাফির শখ থাকে, অ্যান্টিলোপ ক্যানিয়নের চেয়ে সুন্দর আলোছায়ার মিশ্রণ পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া দুষ্কর।
তারপর দুপুরের মধ্যেই চলে যাওয়া আরেক অপরূপ বিস্ময় ‘হর্স শ্যু বেন্ড’-এ। আগের ছবি দেখে ছোটখাটো কোনো স্পট বলে যে ভ্রম ছিল তা নিমেষেই দূর হয়ে গেল। বিশাল গিরিখাতের মতো জলপ্রবাহের মাঝখানে শৈলপর্বত। চোখ দিয়ে না দেখলে ছবি দেখে এই সৌন্দর্য অনুমান করা নেহাত বোকামি হবে।
যাই হোক, পেজ শহরে দুপুরের খাবার শেষে আমাদের আবার আড়াই ঘণ্টার যাত্রা শুরু। এবার অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে। গন্তব্য ফ্ল্যাগস্ট্যাফ শহর। এই পথে না চললে সত্যিই বোঝা যেত না লালবর্ণের পোড়ামাটি রঙের পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে সাদা হতে হতে তারপর কীভাবে সবুজ হয়ে গেল। আর আমরাও পৌঁছে গেলাম ৭ হাজার ফুট উচ্চতায়, সবুজ পাহাড়ের শহর ফ্ল্যাগস্ট্যাফে। সেখানে সুদীর্ঘ যাত্রার পরে প্রথম রাতের বিরতি।
ক্লান্ত শরীরের ঘুম অ্যালার্মের সর্বোচ্চ প্রয়োগে ভেঙে গেল। পরদিন খুব ভোরে যাত্রা করলাম গ্রান্ড ক্যানিয়ন-সাউথ রিম ভিজিটরস ট্রেল সেন্টারের উদ্দেশে। এবারে কিছুটা ভিন্ন পথে দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে পাহাড়ের সবুজ থেকে লাল বর্ণ রূপান্তর দশা দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম গ্রান্ড ক্যানিয়ন বলতেই যে দৃশ্যপট বোঝায় সেখানে। নর্থ রিম ও সাউথ রিমের মিলনস্থল প্রায় ৬ হাজার ফুট গভীরে দুই প্রান্তের বিভাজক প্রমত্তা কলোরাডো নদীও যেখানে দেখতে বিন্দুসম। প্রায় সাড়ে চার শ কিলোমিটারের অপরূপ কলোরাডো প্লেটের ধাপে ধাপে বিভাজন বুঝতে গিয়ে ট্রেইল করলাম প্রায় আট-নয় কিলোমিটার। সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে হতে নেটিভ আমেরিকান হোপিদের বিশ্বাসের কথা মনে পড়ে গেলো—THE GRAND CANYON IS A GATEWAY TO THE AFTERLIFE। পরিবার-পরিজনসহ বারবার যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দুপুরের পরে বিদায় নিলাম গোটা পৃথিবীর অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থান গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন থেকে।
আবারও ভিন্ন একটা পথে সুদীর্ঘ যাত্রা শেষে পৌঁছালাম ঝলমলে আলোর শহর লাস ভেগাসে। ক্যাসিনো, বার আর উন্মাতাল উদ্যাপনের কেন্দ্র লাস ভেগাস আমাদের ছড়ানো ভ্রমণ পরিকল্পনার চারটি অঙ্গরাজ্যের মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় ঘুরেফিরে বারবার এ শহরেই আসা। কিন্তু আলোর রাত দেখার সুযোগ শুধু এ রাতেই। তাই প্রায় শেষ রাত পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে দেখা ফ্রিমোন্ট স্ট্রিট, প্যারিস হোটেল, আইফেল টাওয়ারের আলোকজ্জ্বল কপি, সিজারস প্যালেসের সামনে ফুট ওভারব্রিজে উঠে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে ঝকমকে আলোকোজ্জ্বল উন্মাদনা অঙ্গন। তারপর হেঁটে হেঁটে শহর দেখার ক্লান্তি নিয়ে বার, ক্যাসিনো ও স্ট্রিপ ক্লাবের উদাত্ত আহ্বান উপেক্ষা করে পাঁচজন সাধু যুবক হোটেলে ফিরে দিলাম শান্তির ঘুম।
ঘুম কিছুটা বেশি সকাল পর্যন্ত হয়ে যাওয়ায় পরদিন এর পরিকল্পনা ভয়ংকর থেকে ভয়ংকরতর হয়ে গেল। কারণ, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য অ্যাডভেঞ্চারাস; গন্তব্য পৃথিবীর উষ্ণতম স্থান ‘ডেথ ভ্যালি’। যেখানে যাওয়ার জন্য গরমকাল এমনিতেই খুব ভয়ংকর। গেলেও খুব সকালে যেতে উপদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সিন-সিটির ঘুমের রেশ কাটিয়ে আমরা ডেথ ভ্যালিতে পৌঁছালাম সবচেয়ে ভয়ংকর দাবদাহের সময় মধ্যদুপুরে। উত্তর আমেরিকার সমচেয়ে নিচু স্থান ডেথ ভ্যালির ব্যাড ওয়াটার বেসিনে কয়েক মুহূর্তের জন্য গাড়ি থেকে বের হয়ে সত্যিই মনে হলো এটার নাম ‘মৃত্যু উপত্যকা’ই যথার্থ। প্রচণ্ড দাবদাহে হিটিং অ্যালার্ট দিয়ে সহযাত্রীদের আইফোন বন্ধ হয়ে গেল। কোনো প্রকার নেটওয়ার্ক ছাড়া বৈরী প্রকৃতির ভয়ংকর সৌন্দর্য আতঙ্কের সঙ্গে উপভোগ করছি আর ভাবছি যদি শুধু গাড়ির এসিটা কিছুক্ষণের জন্য কাজ না করে, তাহলে এই যাযাবর পর্যটক বাহিনীর অস্তিত্বও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে রাস্তায় তাকিয়ে দেখি কেউ একজন বাইসাইকেল চালিয়ে ডেথ ভ্যালি পাড়ি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নেমেছে। সেই মুহূর্তে কিছু মানুষের সক্ষমতার মাত্রা দেখে বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে রইলাম।
তারপর মৃত্যু উপত্যকায় শত মাইলেরও বেশি পাড়ি দিয়ে প্রায় সমপর্যায়ের চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ায় ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে দিনব্যাপী যাত্রা শেষে সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার পূর্বমূহূর্তে পৌঁছালাম প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে, সান্তা মোনিকা সৈকতে। দীর্ঘ দাবদাহ এলাকা পাড়ি দিয়ে সমুদ্রে নামার প্রশান্তি পেল সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা। কিছুক্ষণ ঢেউয়ের সঙ্গে আলাপ করে, শঙ্খচিলের সঙ্গে মিতালি মাখা ছবি তুলে চলে গেলাম লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে। সেখানে হলিউডের সব বিখ্যাত ব্যক্তির নাম-সংবলিত ওয়াক অব ফেমে হাঁটাহাঁটি। একাডেমি অ্যাওয়ার্ড অস্কার প্রদানের সেই ডলবি থিয়েটারসহ আরও কত কত রাত উদ্যাপনের সাক্ষী পাহাড়ি শহর লস অ্যাঞ্জেলেস খুব স্বল্প সময়ে যতটা দেখা সম্ভব দেখে নিলাম।
পরদিনের পরিকল্পনা গ্রিফিথ অবজারভেটরি যেখানে পাহাড়ের গায়ে লেখা HOLLYWOOD। কিন্তু অবজারভেটরির চূড়ায় গিয়ে তিন-চার চক্কর দিয়েও যখন গাড়ি পার্ক করতে পারছি না ভিড়ের কারণে তখন ঘড়ি বলছে আমাদের ফিরতে হবে লাস ভেগাস শহরে, যা আরও পাঁচ ঘণ্টার পথ। আমাদের মতো গরিব ছাত্রদের একমাত্র সম্বল স্পিরিট এয়ারলাইনসের ফ্লাইট, দেরি করে ফেললে তা-ও ছুটে যাবে। তাই কিঞ্চিৎ অতৃপ্তি নিয়েই অনাবিল প্রশান্তিমাখা একটা ভ্রমণের শেষ সড়কযাত্রায় পাহাড় ধরে ধরে চলে এলাম লাস ভেগাসে। অ্যারোপ্লেনের জানালা দিয়ে ফিরতি যাত্রায় যখন তাকাচ্ছি, তখন আলোকোজ্জ্বল লাস ভেগাস আকাশের চাঁদকে স্তিমিত করে দিয়ে উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে, আবার এসো।
ইউনিভার্সিটি অব নিউ অর্লিন্স, লুইজিয়ানা থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

‘বাবা’র কাছে এসে বৌ হারালেন কমলেশ

Sharing is caring!FacebookTwitterGoogle+Pinterest ২০১৫ সালের ঘটনা। স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে গিয়েছিলেন গুরু-সাক্ষাতে। সংসারে নিত্য অভাব-অভিযোগ, অশান্তি। যদি ...