Home » সারাদেশ » সরকারেই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে সংবিধান

সরকারেই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে সংবিধান

সংবিধানকে প্রতিপাদ্য করে নিজেদের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধেই এবার সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় সংসদের সাংবিধানিক কমিটির অনুশাসন না মেনে সরকারের মন্ত্রীরা প্রতিনিয়ত সংবিধান লঙ্ঘন করছেন। আর এ কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

জাতীয় সংসদ ভবনে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। কমিটির সদস্যরা সাংবিধানিক কমিটির অনুশাসন না মানাকে সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন অভিহিত করেন। আলোচনা শেষে কমিটি সংশ্লিষ্টদের অতিদ্রুত অনুশাসনগুলো প্রতিপালন করে ১৫ দিনের মধ্যে কমিটিকে অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছে।

কমিটির সভাপতি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য একেএম মাঈদুল ইসলাম, মো. আব্দুস শহীদ, মো. রুস্তম আলী ফরাজী, মো. শামসুল হক টুকু এবং ওয়াসিকা আয়েশা খান অংশ নেন। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খানসহ মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, অডিট অফিসের কর্মকর্তা এবং সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

কমিটি সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে কমিটির দেয়া অনুশাসনগুলো প্রতিপালনের বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। সর্বশেষ (২৭তম) বৈঠকটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওই বৈঠকে মোট ৮টি অডিট আপত্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ৪টি আলোচিত এবং ৪টি অনালোচিত অডিট আপত্তি। ওইদিন কমিটি ৮টি অডিট আপত্তির বিষয়ে ৮টি অনুশাসন দিয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ২টি অনুশাসন। বাকি ৬টিই বাস্তবায়িত হয়নি। এর আগের বৈঠকগুলোতে দেয়া অনুশাসনগুলোর বাস্তবায়নের চিত্রও প্রায় একই।

এদিকে জাতীয় সংসদের আরেক সাংবিধানিক কমিটি সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির অনুশাসনও বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদের ভূমিকা ও দায়িত্ব অনেক। কিন্তু গত চার বছরেও এই কমিটি প্রশাসনের দক্ষতা বাড়াতে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি ইতিমধ্যে সরকারি সংস্থাগুলোর অব্যবস্থা ও অসঙ্গতি নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন দিলেও দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। নবম সংসদের শুরুর দিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটির তৎকালীন সভাপতি মহীউদ্দিন খান আলমগীর দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের তলব করে আলোচিত হয়েছিলেন। যদিও ওইসব তলবের পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছিল বলেও তখন অভিযোগ ওঠে।

সংসদের কার্যপ্রণালিবিধিতে দেয়া ক্ষমতাবলে এই কমিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব ও প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এবং সরকারি নীতিমালা ও এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়াদির পার্থক্য চিহ্নিত করে। সেই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ সম্পর্কে মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কোনো রিপোর্ট থাকলে তা পরীক্ষা করা, স্বায়ত্তশাসনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠু ও বিচক্ষণ বাণিজ্যিক নীতি ও নিয়ম-কানুন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কিনা তা তদারক করা; সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করা এবং প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করাও এ কমিটির এখতিয়ারের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ বা পরামর্শ মানতে কোনো মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠান বাধ্য নয়। যে কারণে নিয়মিত বৈঠকে এবং সংসদে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে নানারকম সুপারিশ থাকলেও অনেক সময়ই সেগুলো কাগজবন্দি হয়ে থাকে।

কমিটির সংক্ষুব্ধ সদস্যরা জানান, দশম সংসদের গত চার বছরে তারা এ যাবত অনেকগুলো বৈঠক করেছেন এবং বৈঠকের অনুশাসন সম্বলিত প্রতিবেদনও সংসদে পেশ করেছেন। এসব বৈঠকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো চলছে কিনা, তাদের সমস্যাগুলো কী এবং সমস্যা কাটিয়ে উঠে প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে শক্তিশালী হতে পারে, সে বিষয়ে তারা নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছেন। প্রশাসনে যারা আছেন, তাদের আই ওপেনিং করা হচ্ছে। তারা যাতে সেগুলো সংশোধন করে ভবিষ্যতে স্বচ্ছতা ও পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে এবং দুর্নীতিমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করেন, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। তারা জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে আর্থিক বিষয়াদি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং তাদের সুপারিশের ফলে অনেক অনিয়ম দূর হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন যাবৎ যেসব অনিয়ম হয়ে এসেছে, এটা রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে কমিটির দেয়া অনুশাসনগুলো বাস্তবায়ন জরুরি।
নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কমিটি ব্যবস্থা আইন পরিষদের বিশেষ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে অর্থ ও নিরীক্ষা কমিটিগুলোকে সরকারের ব্যয়ের ওপর তদারককারীর ভূমিকা পালনের জন্য সংসদের বিশেষ যন্ত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সবগুলো কমিটি গঠন করা হলেও সংসদের চার বছরেও কমিটিগুলো জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে কতটুকু সক্ষম হচ্ছে- সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/বিএএফ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

গড়ছে ভাঙছে দল ও জোট

Sharing is caring!FacebookTwitterGoogle+Pinterestএকাদশ সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নতুন নতুন দল ও জোট গঠন ...